ভারত ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হতে চায়। এ লক্ষ্য অর্জনের পথে দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হতে পারে মাথাপিছু বার্ষিক জিডিপি ১০ হাজার ডলারে উন্নীত করা।ভারতের অর্থনীতি, উন্নয়ননীতি ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরে এমনই বিশ্লেষণ করেছেন ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমির সম্পাদকীয় পরিচালক এরিক শাটজকার।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে ভারত কীভাবে একদিকে আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও নাগরিক সেবার ঘাটতির মতো সমস্যার মুখোমুখি থাকছে তা তিনি দেখিয়েছেন।
শাটজকার সম্প্রতি ১৮ মাসের মধ্যে সপ্তমবারের মতো ভারত সফর করেন। এর আগে দেশটি সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল সীমিত।
যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডবাজারের অস্থিরতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার পর শাটজকার মন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় নিউ ইকোনমি ফোরামে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে গোলটেবিল আলোচনায় তিনি কোন বিষয়টি তুলে ধরতে চান। ভারতের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ও ইলেকট্রনিকস খাতের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হবে বলে ধারণা করেছিলেন শাটজকার।
আলোচনা শেষে বিদায়ের সময় শাটজকারের হাত ধরে বৈষ্ণব বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা যেন ১০ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারি।’
এখানে ১০ হাজার ডলার বলতে মাথাপিছু বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বোঝানো হয়েছে। এটি প্রত্যেক ভারতীয়ের ব্যক্তিগত আয় ১০ হাজার ডলার হওয়া নয়।বরং একটি দেশের মোট বার্ষিক উৎপাদনের আর্থিক মূল্যকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু জিডিপি পাওয়া যায়। শাটজকার জানান, বর্তমানে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৩ হাজার ডলার। এই অবস্থান থেকে ১০ হাজার ডলারে পৌঁছানো দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চূড়ান্ত লক্ষ্য ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশকে ‘বিকশিত ভারত’ বা উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করা। ওই বছর ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্ণ হবে।
শাটজকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে ২০৪৭ সালের মধ্যে মাথাপিছু জিডিপি ১৮ হাজার ডলারের বেশি করার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য পরবর্তী দুই দশক ধরে বছরে প্রায় ৭ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হলেও চীনসহ অল্প কয়েকটি দেশ অতীতে এ ধরনের সাফল্য দেখিয়েছে।
উন্নয়ন ও বৈষম্যের পাশাপাশি অবস্থান
ভারতের অর্থনীতির এই লক্ষ্য বোঝার জন্য দেশটির দৃশ্যমান বৈপরীত্যগুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন শাটজকার। মুম্বাইয়ের উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, একই শহরে বিপুল সম্পদ ও চরম দারিদ্র্য পাশাপাশি অবস্থান করছে। শহরটিতে এক ধনকুবের পরিবারের ব্যক্তিগত আবাস হিসেবে ২৭ তলা ও প্রায় চার লাখ বর্গফুটের একটি ভবন রয়েছে। অথচ কাছাকাছি এলাকার শিশুরা রাস্তার মাঝের মাটির জায়গায় খেলাধুলা করে। তাঁর লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, মুম্বাইয়ের আনুমানিক ৪২ শতাংশ মানুষ বস্তিতে বসবাস করে।
শুধু সম্পদের বৈষম্য নয়, ভারতের অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার মধ্যেও রয়েছে বড় ব্যবধান। দিল্লিতে রয়েছে আধুনিক মেট্রোরেল ব্যবস্থা, কিন্তু শহরটির বায়ুদূষণও গুরুতর। দেশটি ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআইয়ের মতো দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ডিজিটাল লেনদেনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। অথচ অনেক শহরে এখনো বর্জ্য সংগ্রহ, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ও পয়োনিষ্কাশনের মতো মৌলিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে আছে।
একইভাবে, ভারত দিল্লি ও মুম্বাইয়ের মধ্যে যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বিশ্বমানের দ্রুতগতির এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করছে। কিন্তু দেশের অনেক স্থানীয় সড়কে এখনো বড় বড় গর্ত রয়েছে।
শাটজকারের মতে, এসব বৈপরীত্যের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সরকারের সীমিত সম্পদ, সময় ও প্রশাসনিক সক্ষমতা। একটি সরকার একই সঙ্গে সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। ফলে কিছু খাতে দ্রুত উন্নয়ন ঘটলেও অন্য খাতগুলো পিছিয়ে থাকতে পারে। ভারতের উন্নয়ননীতিকে বোঝার ক্ষেত্রে এই অগ্রাধিকারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বড় শিল্পগোষ্ঠীর ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ
ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাখ্যায় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন শাটজকার। তাঁর মতে, বন্দর, তেল শোধনাগার, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কারখানা নির্মাণে দেশটির বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এসব অবকাঠামো বিনিয়োগ আকর্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয়।
শাটজকারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন মোদি সরকার অল্প কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টি মেনে নিয়েছে এবং কখনো কখনো সেই প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে। ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে এই শিল্পগোষ্ঠীগুলোর স্বার্থ ও ভূমিকা জড়িয়ে রয়েছে।
তবে এখানে উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রয়েছে। বড় শিল্পগোষ্ঠী যদি অবকাঠামো নির্মাণ, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে, তাহলে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছায়, সম্পদের বৈষম্য কতটা কমে এবং নাগরিক সেবার মান কতটা উন্নত হয়, সেগুলোও উন্নয়নের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, দেশের মোট উৎপাদন বাড়া এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়া সম্পর্কিত হলেও দুটি বিষয় এক নয়। মাথাপিছু জিডিপি অর্থনীতির গড় উৎপাদনের একটি সূচক; এটি আয়বণ্টন বা সামাজিক বৈষম্যের পূর্ণ চিত্র দেয় না।
চীন থেকে বিনিয়োগ আনা ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা
শাটজকার বলেছেন, ২০১৪ সালে মোদি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ভারতের মোট জিডিপি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এখন দেশটির সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে, চীন থেকে আরো উৎপাদন কার্যক্রম ভারতে আনতে এবং বৈশ্বিক মহাকাশ প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে চায়।
সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনে ভারতের অগ্রগতিও এই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু নতুন শিল্প স্থাপন নয়; বরং বিনিয়োগ আকর্ষণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা।
তবে ২০৪৭ সালের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার বজায় রাখাই যথেষ্ট হবে না।
অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নাগরিক সেবা এবং সম্পদের বণ্টনের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে এসব খাতের উন্নয়ন প্রয়োজন।
১০ হাজার ডলারই কি উন্নয়নের চূড়ান্ত মাপকাঠি?
শাটজকারের কাছে অশ্বিনী বৈষ্ণবের বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এটি ভারতের উন্নয়ননীতির অগ্রাধিকার সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। দেশটির সরকার জাতীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে সামনে রেখে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগে জোর দিচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনের পথে কিছু সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান না-ও হতে পারে।
শাটজকার লিখেছেন, মন্ত্রীর কণ্ঠের দৃঢ়তা ও চোখের অভিব্যক্তি থেকে তিনি বুঝেছিলেন, লক্ষ্য অর্জনে ভারত যা যা প্রয়োজন, তা করতে প্রস্তুত। এই উপলব্ধির মধ্য দিয়ে ভারতের নানা বৈপরীত্য তাঁর কাছে কিছুটা বোধগম্য হয়ে ওঠে।
তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অর্থ এই নয় যে বৈষম্য বা নাগরিক সেবার ঘাটতি গুরুত্বহীন। বরং ভারতের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে দেশটি কীভাবে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে এসব সমস্যার সমাধানের সমন্বয় ঘটাতে পারে, তার ওপরও।
১০ হাজার ডলারের মাথাপিছু জিডিপি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। কিন্তু উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার অর্থ শুধু উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধি নয়; সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান, সুযোগের সমতা, পরিবেশের সুরক্ষা এবং মৌলিক নাগরিক সেবার উন্নয়নও এর অংশ।
ভারতের সামনে তাই চ্যালেঞ্জটি দ্বিমুখী। একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রেখে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করা, অন্যদিকে সেই অগ্রগতির সুফল আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’ লক্ষ্য কতটা সফল হবে, তা শেষ পর্যন্ত এই দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করবে।
